নিজস্ব প্রতিবেদক, চ্যানেল নিউজ ঢাকা, ১৭ মে, ২০২৬ : দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় এক অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জুয়ার সাইট পরিচালনা করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং তা বিদেশে পাচার করার অভিযোগে চক্রের মূলহোতাসহ ৮ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)।
সিআইডি জানিয়েছে, চক্রটি গত ৬ মাসে দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করেছে এবং এর একটি বড় অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে।
দুই দফায় সাঁড়াশি অভিযান ও গ্রেফতার
সিআইডির সাইবার মনিটরিং সেল নিয়মিত অনলাইন নজরদারির সময় এই চক্রটির সন্ধান পায়। এরপর পল্টন মডেল থানায় ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর অধীনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে প্রথম অভিযানে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ থেকে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্য এবং ২৪/৭ অনলাইন সার্ভিলেন্সের ডেটা বিশ্লেষণ করে গত ১৬ মে ২০২৬ তারিখে নরসিংদী ও ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে আরও ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন:
১. মো. আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ (৩২) – কিশোরগঞ্জ
২. সজীব চক্রবর্তী (২৯) – কিশোরগঞ্জ
৩. মো. আশরাফুল ইসলাম (৪০) – কিশোরগঞ্জ
৪. মো. জসীম উদ্দীন (৩৬) – ময়মনসিংহ
৫. তৈয়ব খান (২৬) – নরসিংদী
৬. সৌমিক সাহা (২৮) – নরসিংদী
৭. মো. কামরুজ্জামান (৩৬) – লক্ষ্মীপুর
৮. আব্দুর রহমান (৪৭) – কিশোরগঞ্জ
যেভাবে চলতো অবৈধ লেনদেন ও পাচার
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ আসছিল। জুয়াড়িরা টাকা লেনদেনের জন্য বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে সুকৌশলে বিদেশে পাচার করা হতো।
বিপুল পরিমাণ আলামত জব্দ
দুইটি ধারাবাহিক অভিযানে সিআইডি আসামিদের কাছ থেকে ডিজিটাল জালিয়াতির গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করেছে:
১৩টি মোবাইল ফোন (প্রথম অভিযানে ৭টি ও দ্বিতীয় অভিযানে ৬টি)
২০টি সিম কার্ড (এর মধ্যে ২টি এজাহারভুক্ত বিকাশ এজেন্ট সিম ও ১৮টি বিভিন্ন অপারেটরের সিম)
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভুয়া এজেন্ট সিম পাঠানোর প্রমাণসহ সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কাস্টমার কপি ও রসিদ।
সিআইডির সাইবার পেট্রোলিং ও কঠোর অবস্থান
অনলাইন জুয়া ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন বন্ধে সিআইডি তাদের সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করেছে। কেবল চলতি মে মাসের ১ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের সুপারিশে বড় ধরনের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:
সিআইডির সাইবার অ্যাকশন (মে ২০২৬) সংখ্যা
বন্ধের জন্য বিটিআরসিতে পাঠানো জুয়ার ওয়েবসাইট ১১৬টি
অবৈধ লেনদেনের দায়ে বিএফআইইউতে পাঠানো এমএফএস (বিকাশ/নগদ/রকেট) হিসাব ৮৭৯টি
অবৈধ লেনদেনের দায়ে বিএফআইইউতে পাঠানো ব্যাংক হিসাব ৪৩টি।
সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য অজ্ঞাত সদস্যদের শনাক্ত করা এবং অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটনে তাদের তদন্ত কার্যক্রম ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Leave a Reply